হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ: বুক ব্যথা, জরুরি করণীয় ও প্রতিরোধ
হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হয় যখন হৃদযন্ত্রের করোনারি ধমনি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে হার্টের পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রধান লক্ষণ — বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ
হার্ট অ্যাটাক সবসময় সিনেমার মতো নাটকীয়ভাবে হয় না। কারও ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে হঠাৎ তীব্র চাপ, কারও বাম হাত ভারী লাগা বা অতিরিক্ত ঘাম — লক্ষণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে একটু আলাদা হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত: দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোই একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত মৃত্যু বাড়ছে এবং কম বয়সীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাক এখন ঘটছে। অনেকে লক্ষণ চিনতে পারেন না বা পরিবার সঠিক করণীয় জানেন না — এই দুটোই সবচেয়ে বড় বিপদ। এই লেখায় আমরা জানব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ, কারণ, সেই মুহূর্তে কী করতে হবে এবং কীভাবে আগে থেকেই ঝুঁকি কমাবেন।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী কী?
- ⚠️ বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ বা ব্যথা — মুষ্টিবদ্ধ হাতে চাপ দেওয়ার মতো অনুভূতি, ভেতর থেকে ব্যথা হওয়া
- ⚠️ বাম হাত ও ঘাড়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া — চোয়াল বা পেটেও ব্যথা হতে পারে
- ⚠️ শ্বাসকষ্ট — সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা বা শুয়ে থাকতেও কষ্ট
- ⚠️ অতিরিক্ত ঘাম — ঠান্ডা ঘাম, রক্তচাপ কমে যাওয়া
- ⚠️ বমি বমি ভাব বা বমি
- ⚠️ বুক ধড়ফড় করা
- ⚠️ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া — ব্যথার তীব্রতা বেশি হলে
মনে রাখুন: হার্ট অ্যাটাক সবসময় মারাত্মক বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয় না — কারও কারও হালকা অস্বস্তি, বমি বা ঘাম থেকে শুরু হয়। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ আরও ভিন্ন হতে পারে। সন্দেহ হলে দেরি না করুন।
নারী, বয়স্ক ও ডায়াবেটিস রোগীর লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে
সব হার্ট অ্যাটাকে তীব্র বুকব্যথা থাকে না। নারী, বয়স্ক মানুষ ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি বেশি দেখা যেতে পারে। তাই বুকব্যথা না থাকলেও সন্দেহ হলে দেরি করবেন না।
গ্যাসের ব্যথা নাকি হার্ট অ্যাটাক — কীভাবে বুঝবেন?
বাংলাদেশে অনেকেই হার্ট অ্যাটাকের প্রথম লক্ষণকে "গ্যাসের ব্যথা" ভেবে সময় নষ্ট করেন — এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
গ্যাসের ব্যথা সাধারণত খাবারের পর পেটে অস্বস্তি, ঢেকুর বা বুকজ্বালার সাথে থাকে। কিন্তু বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা বাম হাত/ঘাড়/চোয়ালে ছড়ালে, সাথে ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে — এটিকে গ্যাস ভেবে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক। সন্দেহ হলে দ্রুত হাসপাতালে যান।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ 💬
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (NICVD) সহযোগী অধ্যাপক ও উপপরিচালক ডা. কাজল কুমার কর্মকার হার্ট অ্যাটাক ও তাৎক্ষণিক করণীয় নিয়ে বলেন —
"হার্ট অ্যাটাক এমন একটি সমস্যা যার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে রোগী যেকোনো সময় মারা যেতে পারে। বুকে ব্যথা অনুভূত হলে, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ মনে হলে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে জরুরি স্বাস্থ্য সেবায় (৯৯৯) ফোন করতে পারেন।"
চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন —
"ইসিজি ও রক্ত পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কিনা নিশ্চিত হবে। হার্টের চিকিৎসায় রক্তনালীর ব্লক দূর করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক বা পুনঃপ্রতিস্থাপন করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।"
— ডা. কাজল কুমার কর্মকার সহযোগী অধ্যাপক ও উপপরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NICVD), ঢাকা (সূত্র: The Daily Star Bangla, সেপ্টেম্বর ২০২৪)
হার্ট অ্যাটাক হলে তাৎক্ষণিক কী করবেন
প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ — হৃদযন্ত্রের পেশি রক্ত ছাড়া মিনিটে মিনিটে নষ্ট হতে থাকে।
⚠️ হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে বাসায় অপেক্ষা করবেন না, নিজে গাড়ি চালাবেন না এবং "গ্যাসের ব্যথা" ভেবে সময় নষ্ট করবেন না — ৯৯৯-এ ফোন করুন বা দ্রুত নিকটস্থ জরুরি বিভাগে যান।
✅ ৯৯৯-এ ফোন করুন বা সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান
✅ রোগীকে শান্ত রাখুন, বেশি নড়াচড়া করাবেন না
✅ রোগীকে আধশোয়া অবস্থায় রাখুন (হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে)
✅ অ্যাসপিরিন — জরুরি সেবায় ফোন করার পর, রোগী সচেতন থাকলে এবং অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি, সক্রিয় রক্তপাত, পেপটিক আলসার বা ব্লাড থিনার ওষুধ সেবনের ইতিহাস না থাকলে ৩০০ মি.গ্রা. অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। সন্দেহ থাকলে ৯৯৯ অপারেটরের নির্দেশনা নিন।
⚠️ কারো আগে থেকে চিকিৎসকের দেওয়া নাইট্রোগ্লিসারিন থাকলে জিহ্বার নিচে দেওয়া যেতে পারে — কিন্তু অন্যদের বেলায় নয়
⚠️ রোগী অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে — ৯৯৯-এ ফোন করুন এবং অপারেটরের নির্দেশনা অনুযায়ী CPR শুরু করুন। CPR জানা থাকলে দ্রুত chest compression দিন — cardiac arrest-এ দেরি না করাই সবচেয়ে জরুরি।
কাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি?
ডা. কাজল কর্মকারের মতে নিচের বিষয়গুলো ঝুঁকি বাড়ায়:
- বাবা-মা বা কাছের স্বজনের হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস
- ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবন
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
- অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ
- রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বা চর্বি
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা
- দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে করণীয়
ডা. কর্মকারের পরামর্শ অনুযায়ী হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে:
✅ নিয়মিত হাঁটুন ও ব্যায়াম করুন — সকাল ও বিকেলে ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটার অভ্যাস
✅ ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করুন
✅ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন — জাঙ্ক ফুড ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলুন
✅ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন — নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ চালিয়ে যান
✅ পরিবারে হার্টের ইতিহাস থাকলে — ২০ বছর বয়সের পর থেকেই নিয়মিত চেকআপ করান
✅ মানসিক চাপ কমান — ঝগড়া, অতিরিক্ত উত্তেজনা এড়িয়ে চলুন
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম বড় প্রতিরোধ — বিস্তারিত জানুন আমাদের উচ্চ রক্তচাপ সম্পূর্ণ গাইড →
উপসংহার
হার্ট অ্যাটাক মানেই মৃত্যু নয় — সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছালে এবং সঠিক চিকিৎসা পেলে বেশিরভাগ রোগী সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারেন। তাই লক্ষণ চেনা, ৯৯৯-এ ফোন করার সাহস রাখা এবং জীবনযাপনে সতর্কতা — এই তিনটিই আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
রক্তচাপ মনিটর, ব্লাড সুগার মিটার ও হার্ট-স্বাস্থ্য পণ্যের জন্য epharma.com.bd ভিজিট করুন।
সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসামগ্রী
- ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মনিটর (রক্তচাপ নিয়মিত মাপতে)
- ব্লাড গ্লুকোজ মিটার ও টেস্ট স্ট্রিপ (ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে)
- ওজন মাপার মেশিন (ওজন নিয়ন্ত্রণে)
ওমেগা-৩ বা হার্ট-হেলথ সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের বিকল্প নয়। সব ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করুন।
📚 তথ্যসূত্র
১. "হার্ট অ্যাটাক কেন হয়, লক্ষণ ও তাৎক্ষণিক করণীয়" — The Daily Star Bangla, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪। ডা. কাজল কুমার কর্মকার, সহযোগী অধ্যাপক ও উপপরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NICVD), ঢাকা। bangla.thedailystar.net
২. WHO — "Cardiovascular diseases (CVDs)" Fact Sheet — হৃদরোগ বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ; তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকি কমানো যায়। who.int
৩. NHS — "Heart attack" — লক্ষণ, জরুরি পদক্ষেপ ও Aspirin-এর ভূমিকা। nhs.uk
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে প্রধান লক্ষণ কী?
উত্তর: বুকের মাঝখানে মুষ্টি চাপের মতো তীব্র ব্যথা বা চাপ, যা বাম হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঙ্গে ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা বমি থাকতে পারে।
প্রশ্ন ২: হার্ট অ্যাটাক হলে সঙ্গে সঙ্গে কী করব?
উত্তর: ৯৯৯-এ ফোন করুন বা সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যান। রোগীকে শান্ত রাখুন, বেশি নড়াচড়া করাবেন না। জরুরি সেবায় ফোন করার পর রোগী সচেতন থাকলে এবং অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি, সক্রিয় রক্তপাত, পেপটিক আলসার বা ব্লাড থিনার ব্যবহারের ইতিহাস না থাকলে ৩০০ মি.গ্রা. অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। সন্দেহ থাকলে ৯৯৯ অপারেটরের নির্দেশনা নিন।
প্রশ্ন ৩: হার্ট অ্যাটাক কি শুধু বয়স্কদের হয়?
উত্তর: না। বাংলাদেশে কম বয়সীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাক বাড়ছে। ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও পারিবারিক ইতিহাস যেকোনো বয়সেই ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশ্ন ৪: হার্ট অ্যাটাক ও অ্যানজাইনার পার্থক্য কী?
উত্তর: করোনারি ধমনি আংশিক বন্ধ হলে অ্যানজাইনা (বুকে ব্যথা, বিশ্রামে কমে)। সম্পূর্ণ বন্ধ হলে হার্ট অ্যাটাক — এতে বিশ্রামেও ব্যথা কমে না এবং জরুরি চিকিৎসা লাগে।
প্রশ্ন ৫: CPR কে দিতে পারবেন?
উত্তর: শুধু যিনি CPR সঠিকভাবে জানেন। না জেনে ভুল CPR দেওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। না জানলে ৯৯৯-এ ফোন করুন এবং অপারেটরের নির্দেশনা মেনে চলুন।
প্রশ্ন ৬: হার্ট অ্যাটাক থেকে বেঁচে গেলে কি স্বাভাবিক জীবন সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ। সময়মতো চিকিৎসা ও পরে খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও ওষুধ মেনে চললে হার্ট অ্যাটাকের পরও স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব।

