ডায়াবেটিসে চোখের সমস্যা: রেটিনোপ্যাথির লক্ষণ ও কখন চোখ পরীক্ষা করবেন
ডায়াবেটিসে চোখের সমস্যা শুরুতে বোঝা যায় না। রেটিনোপ্যাথির লক্ষণ, চোখ পরীক্ষার সময়, চিকিৎসা ও দৃষ্টি রক্ষার উপায় জানুন।
চোখে কোনো সমস্যা নেই—তবুও পরীক্ষা কেন?
ডায়াবেটিস নিয়ে আপনি হয়তো নিয়মিত সুগার মাপেন, ওষুধ খান, কিন্তু চোখ পরীক্ষা শেষ কবে করেছেন মনে নেই। কারণ চোখে ব্যথা নেই, দেখতেও ভালোই পাচ্ছেন। বিপদ হলো, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি অনেক সময় চোখের ভেতরে নিঃশব্দে শুরু হয়। তাই ঝাপসা দেখার অপেক্ষা না করে রেটিনা পরীক্ষা করানোই গুরুত্বপূর্ণ। আগে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি আসলে কী?
রেটিনা হলো চোখের পেছনের আলো-সংবেদী পর্দা। দীর্ঘদিন রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকলে এর ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নালি থেকে তরল বা রক্ত বের হওয়া, রেটিনার কেন্দ্রে ম্যাকুলার ফোলা এবং পরে অস্বাভাবিক নতুন রক্তনালি তৈরি হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। শুরুতে দৃষ্টি স্বাভাবিক থাকা মানে রেটিনা সুস্থ—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কোন ধাপে কী ধরনের পরিবর্তন হয়?
প্রাথমিক বা non-proliferative retinopathy-তে রক্তনালির ছোট পরিবর্তন শুরু হয়। রোগ বাড়লে রক্তক্ষরণ বা রক্ত সরবরাহের সমস্যা হতে পারে। Proliferative retinopathy-তে নতুন ভঙ্গুর রক্তনালি তৈরি হয়ে চোখের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। Diabetic macular edema-তে রেটিনার মাঝখানে তরল জমে পড়া বা মুখ চিনতে অসুবিধা হতে পারে। কোন পর্যায়ে রোগটি আছে তা শুধু পরীক্ষাতেই বোঝা যায়।
ডায়াবেটিসে চোখের সমস্যার সতর্ক লক্ষণ
দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া, চোখের সামনে কালো বিন্দু বা সুতো ভাসতে দেখা, মাঝখানের দৃষ্টিতে ফাঁকা অংশ, রাতে দেখতে সমস্যা, বা দৃষ্টি দ্রুত কমে যাওয়া সতর্কসংকেত। তবে এগুলো অনেক দেরিতেও দেখা দিতে পারে। হঠাৎ অনেক নতুন floaters, পর্দার মতো অন্ধকার, দ্রুত দৃষ্টিহানি বা তীব্র ব্যথা হলে নির্ধারিত ফলোআপের অপেক্ষা নয়—সেদিনই জরুরি চক্ষু চিকিৎসা নিন।
কখন প্রথম চোখ পরীক্ষা ও কত দিন পরপর?
American Diabetes Association-এর 2026 নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক টাইপ ২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ার সময়ই পূর্ণ dilated eye examination দরকার। প্রাপ্তবয়স্ক টাইপ ১ ডায়াবেটিসে সাধারণত রোগ শনাক্তের পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম পরীক্ষা করা হয়। এরপর অধিকাংশের নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন। আগের এক বা একাধিক পরীক্ষায় রেটিনোপ্যাথি না থাকলে ও সুগার ভালো নিয়ন্ত্রণে থাকলে চিকিৎসক ১–২ বছরের ব্যবধান বিবেচনা করতে পারেন। রেটিনোপ্যাথি থাকলে অন্তত বছরে একবার, রোগ বাড়লে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা লাগতে পারে। শিশুদের সময়সূচি আলাদা। UK NHS-এর screening interval ঝুঁকিভিত্তিক এবং তাদের সংগঠিত screening program-এর অংশ—নিজে থেকে অন্য দেশের interval অনুসরণ করবেন না।
গর্ভাবস্থায় কী আলাদা সতর্কতা?
আগে থেকেই টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময় বা গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে চোখ পরীক্ষা এবং অবস্থাভেদে পরবর্তী trimester ও সন্তান জন্মের পর পর্যবেক্ষণ দরকার হতে পারে। শুধু গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রথমবার ধরা পড়লে একই retinopathy screening schedule সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। নিজের obstetrician ও eye specialist-এর পরামর্শ নিন।
চোখের পরীক্ষা কীভাবে হয়?
চক্ষু বিশেষজ্ঞ চোখে ড্রপ দিয়ে মণি বড় করে রেটিনা দেখতে পারেন, অথবা retinal photography ও প্রয়োজনে OCT-র মতো পরীক্ষা করতে পারেন। ড্রপের পর সাময়িক ঝাপসা দেখা ও আলোয় অস্বস্তি হতে পারে; সেক্ষেত্রে নিজে গাড়ি না চালানোর পরামর্শ মেনে চলুন। শুধু চশমার পাওয়ার মাপা রেটিনার পূর্ণ পরীক্ষা নয়।
চিকিৎসা কি দৃষ্টি রক্ষা করতে পারে?
চোখের ক্ষতির ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী retina specialist লেজার, চোখের ভেতর injection অথবা জটিল অবস্থায় vitrectomy surgery বিবেচনা করতে পারেন। চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টি কমে যাওয়া ঠেকাতে বা কিছু দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে, তবে সবার সম্পূর্ণ সুস্থতা নিশ্চিত নয়। উপসর্গহীন অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন কোন অভ্যাস চোখ রক্ষায় সাহায্য করে?
চিকিৎসকের নির্ধারিত glucose/HbA1c লক্ষ্য অনুসরণ, রক্তচাপ ও cholesterol নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা ও নির্ধারিত ওষুধ খাওয়া জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ঘরের glucometer ও BP monitor নিজের অবস্থা বুঝতে সহায়ক, কিন্তু এগুলো রেটিনা পরীক্ষা বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। ডায়াবেটিসে কিডনি ও পায়ের সমস্যার দিকেও নজর দিন।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
২০২৫ সালের bdnews24-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডায়াবেটিস রোগী এবং আনুমানিক ১৮ লাখ diabetic retinopathy আক্রান্ত মানুষের কথা বলা হয়েছিল। এগুলো ওই প্রতিবেদনের সময়কার আনুমানিক তথ্য, বর্তমান জাতীয় registry-confirmed সংখ্যা নয়। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো: চোখে সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই screening-এর ব্যবস্থা করা।
সচরাচর প্রশ্ন
ডায়াবেটিসে চোখের কী সমস্যা হতে পারে?
রেটিনার রক্তনালির ক্ষতি বা diabetic retinopathy হতে পারে; ম্যাকুলায় তরল জমলে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে।
রেটিনোপ্যাথির শুরুতে কি লক্ষণ থাকে?
অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না, তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা জরুরি।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে প্রথম চোখ পরীক্ষা কখন?
রোগ ধরা পড়ার সময়ই dilated eye exam করার পরামর্শ দেয় ADA।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে প্রথম পরীক্ষা কখন?
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত রোগ নির্ণয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে; শিশুদের নিয়ম আলাদা।
কত দিন পরপর রেটিনা পরীক্ষা করাব?
ঝুঁকি অনুযায়ী সাধারণত প্রতিবছর; কিছু কমঝুঁকির রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক ১–২ বছর পরপর অনুমোদন করতে পারেন।
সুগার ভালো থাকলেও কি চোখ পরীক্ষা দরকার?
হ্যাঁ, ভালো নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকি কমায় কিন্তু পূর্বের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্ভাবনা বাদ দেয় না।
হঠাৎ দৃষ্টি কমে গেলে কী করব?
একই দিন জরুরি চক্ষু চিকিৎসা নিন।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে চোখ পরীক্ষা লাগে?
আগে থেকেই টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে বিশেষ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।
তথ্যসূত্র
- ADA Standards of Care 2026 — Diabetic retinopathy
- NHS — Diabetic eye screening
- NHS Wales — Diabetic retinopathy
- বাংলাদেশে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি — bdnews24
- প্রথম আলো — ডায়াবেটিস থেকে যখন চোখের সমস্যা হয়
এই লেখা স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য; চোখের সমস্যায় চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরীক্ষার বিকল্প নয়।

